Monday, October 1, 2012

বাঙালি - হুমায়ূন আজাদ

ছেলেবেলায় ছড়া শুনেছিলাম, বাঙালি মানুষ নয়, জন্তু। শুনে নিজের জাতি সম্পর্কে সন্দেহ জেগেছিলো; তবে বিশ্বাস হারাই নি। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো নাকি পাপ; আর একটা পুরো জাতির ওপর বিশ্বাস হারানো তো মহাপাপ। ছেলেবেলায় অতো বড়ো পাপের সাহস হয় নি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সপ্তকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী/রেখেছ বাঙালি ক’রে মানুষ করো নি।’ এখানে ‘বাঙালি’ শব্দটির অর্থ কী? অন্নপায়ী বঙ্গবাসী স্তন্যপায়ী জীবদের জ্বালায় কি অত্যন্ত অতিষ্ঠ হয়েছিলেন বাঙালির মহাকবি? শেষ জীবনে কেনো তিনি জানিয়ে গেলেন, বাঙলায় আর নয়? যদি আবার জন্ম নিতে হয়, তাহলে হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। বাঙলায় নয়। বাঙালির চরিত্র দেখে দেখে ঘেন্না ধ’রে গিয়েছিলো তাঁর মনে। জীবনানন্দ শালিকটালিক হয়ে জন্মাতে চেয়েছিলেন, বাঙালি হিশেবে নয়। বিদ্যাসাগর শেষ জীবনে বাঙালির ওপর বিশ্বাস হারাতে হারাতে মানুষের ওপরেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র ঈশ্বর গুপ্তকে বলেছিলেন ‘খাঁটি বাঙালি’ কবি। খাঁটি হওয়া খুব ভালো, তবে তিনি এও জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাঙলার অবস্থা আবার অধঃপতনের দিকে না গেলে খাঁটি বাঙালি কবি ‘জন্মাবে না, জন্মিয়া কাজ নাই’। দেখতে পাচ্ছি প্রধান বাঙালিরা সবাই বিরূপ বাঙালির ওপর। নিশ্চয়ই বাঙালির কোনো অসামান্য প্রতিভা রয়েছে, যা এমনভাবে হতাশ, বিরূপ, অবিশ্বাসী করে মহৎদের। মিলটনের স্বর্গচ্যুতি মহাকাব্যে স্বর্গ থেকে বহিস্কৃত শয়তান বঙ্গোপসাগর এলাকা দিয়েই নেমেছিলো পৃথিবীতে। ওই প্রথম পতনের সংস্পর্শ কি বাঙালিকে চির অধঃপতিত করে রেখেছে? মালার্মে একটি কবিতায় এমন একটি পাখির কথা বলেছেন, যার বিলুপ্তি আসন্ন। ওই পাখিকে তিনি তুলনা করেছেন বাঙালির সাথে। বাঙালি কি তবে সেই নিয়তিদণ্ডিত জাতি, যার ভাগ্যে রয়েছে শুধু নিন্দা, আর অবলুপ্তি?


পৃথিবীর প্রতিটি জাতিরই কোনো-না-কোনো সদগুণ রয়েছে। স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ওই বৈশিষ্ট্য তাকে পৃথক ক’রে রাখে অন্যান্য জাতি থেকে, ক’রে রাখে বিশিষ্ট। বাঙালির কি অমন কোনো বৈশিষ্ট্য রয়েছে? রয়েছে কোনো সদগুণ? তেমন কোনো বৈশিষ্ট্য সম্ভবত বাঙালির নেই। বাঙালির চরিত্রে গুণের থেকে দোষের পরিমাণ যে অনেক বেশি তাতে সন্দেহ নেই। এ জন্যেই তার প্রধান পুরুষেরা বিরূপ তার ওপর। মধুসূদন কি বাঙালি ছিলেন, বাঙালি ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ? বিদ্যাসাগর কি বাঙালি ছিলেন, বাঙালি ছিলেন বাঙলার অন্যান্য মহাপুরুষ? মনে হয় তাঁরা বাঙালি ছিলেন না। বাঙালি জাতির প্রধান পুরুষ বা মনীষী তাঁরাই, যাঁরা পেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন বাঙালিত্বকে। তাই প্রধান বাঙালি হ’তে হ’লে হ’তে হবে অবাঙালি। হয়তো চরিত্র অর্জন করতে হবে জর্মনের, বা ইংরেজের, জাপানির বা চীনের, ফরাশির বা মার্কিনের বা রুশির। খাঁটি বাঙালি হয়ে মহৎ বাঙালি হওয়া অসম্ভব। বাঙালি বলতে বোঝায় সামান্যতা, হীনতা, তুচ্ছতা। তার চরিত্রের বদগুণের বীজ কিলবিল করে।


কী কী মুক্তোয় খচিত সোনার বাঙালির সোনার চরিত্রটি? বাঙালির চরিত্রমুকুটের কোহিনূর কোনটি বলা মুশকিল, প্রতিটিই রঙে শোভায় আকারে হারিয়ে দিতে চায় প্রতিটিকে। তাই ঐসব মণিমুক্তোর তালিকা ক্রম রেখে তৈরি করা কঠিন। খুব বড়ো ধরনের গবেষণাপ্রকল্প দরকার। বাঙালি মিথ্যুক। মিথ্যা ব’লে চালিয়ে দিতে পারলে সত্য বলার কষ্টটুকু করবে না। বাঙালি প্রতারক। প্রতারণা করতে পারলে বাঙালি বিশেষ তৃপ্তি পায়। আরেকটি প্রতারককে ঠকাতে পারা কি অসামান্য সুখ আর গৌরবের কথা নয়? ব্যবসায় তো প্রতারণাই ধর্ম। দলবেধে ব্যবসায় নেমে বাঙাল এবং একজন অন্যদের ঠকিয়ে বাড়িগাড়ি করে। দু-দিন আগে মুদি দোকান থেকে বাসায় একটি ঠোঙা আসে। তাতে লেখা একটি চিঠি। পত্রলেখক লিখেছেন, ‘আপনার সঙ্গে আর ব্যবসা করিব না। নামাজ-রোজা করেন দেখিয়া ভাবিয়াছিলাম আপনি সৎ। এখন দেখিলাম আপনি অসৎ। আগামী কাল আমার মালগুলি ফিরত দিবেন। নইলে ভালো হইবে না’। প্রতারণা চলছে দিকে দিকে, প্রতারণা ছাড়া বাঙালির ঘরে আলো জ্বলে না। বাঙালি ভণ্ড। ভণ্ডামোতে একশো নম্বর দিতে হবে তাকে। যা বিশ্বাস করে না, তা অবলীলায় ব’লে যাবে। আমলা কবিদের কবিতা প’ড়ে দেখুন। কী দারুণ বিপ্লবী আর প্রগতিশীল তারা। স্যার, স্যার বলতে বলতে থুতু উপচে পড়ছে; কিন্তু কবিতা লিখতে বসলেই বিদ্রোহী, প্রতিবাদী। জনগণের সাথে একাত্ম। বাঙালি চিন্তা করে, চিৎকার করে। আসুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায়, দেখবেন ইলশের বাজারকে ছাড়িয়ে গেছে জ্ঞানকেন্দ্রের করিডোর। অফিসে যান, দেখবেন নিজের টেবিলে কেউ নেই; দোস্তের টেবিলে ব’সে গলা ফুলিয়ে চিৎকার ক’রে চলেছে দায়িত্বশীল বাঙ্গালিগণ।


বাঙালি অলস; বাঙালি ফাঁকি দিতে পারলে ধন্য বোধ করে। কাউকে একটা কাজ দিয়ে চ’লে আসুন, দেখবেন সেটির ওপর কেমন দায়িত্ব পালন চলছে। তাড়া না দিলে এ-গাধা চলে না। লোভের কথা বলবো? লোভে তো লকলক করে বাঙালির সমস্ত শরীর। শরীরটাই একটা বড়ো জিভ হয়ে ওঠে। বাঙালি স্বৈরাচারী ও ক্রীতদাস। ওপরে যে আছে, তার মতো শক্তিমান আর কেউ নেই। তার কথাই শেষ। সে সব জানে, সব বোঝে। নিয়মগুলো তৈরি হয়েছে শুধু সে খানখান ক’রে ভেঙে ফেলবে ব’লে। যাচ্ছেতাই না করতে পারলে শক্তির প্রকাশ কোথায়? প্রতিটি অফিসে একেকজন অসামরিক জেনারেল ব’সে আছেন। বাহুতে বুকে শেলাইকরা তারাটারা নেই, কিন্তু শতোশতো তারা জ্বলছে ব্যক্তিত্বে। অফিসের বড়োবাবুকে সম্মান জানাতে হয়; ‘স্যার’ বলতে হয়। আজকার তার তাতে চলছে না, তাই ‘শ্রদ্ধেয় স্যার’ বলতে হয়। না ব’লে উপায় নেই, নিচের সবাই দাস। জনগণের পয়সায় কেনা দাস। আবেদনপত্র লিখতে হ’লেই সম্বোধন করতে হয় ‘মাননীয়’, ‘মহামান্য’। যে-কোনো অফিসের বড়োসাহের সচিবালয়ের বড়োসাহেবের কাছে গেলেই আবার ক্রীতদাস। লেজ নড়তে থাকে, লেজ নড়তে থাকে। ডারউইনি লেজটি তার মুখগহ্বরে। অন্যরা বানরের বংশধর হ’তে পারে, বাঙালি প্রভুভক্ত জীবের বংশধর; তবে বাঙালি প্রভুভক্ত নয়। বাঙালি মিথ্যুক প্রতারক, ভণ্ড, অলস, স্বৈরাচারী, ক্রীতদাস, চিৎকারপরায়ণ, কাপুরুষ, লোভী, পরশ্রীকাতর, নিন্দুক, গোপনে কামুক প্রকাশ্যে সন্ত, নির্লজ্জ, অসুস্থ, চক্রান্তপরায়ণ, বিশ্বাসঘাতক, দায়িত্বহীন, সময়জ্ঞানহীন, অবিবেচক, নির্মম, অমানবিক, অনুদার, অসৎ, পরপীড়ক, অগণতান্ত্রিক, বিলাসী, খল, যুক্তিহীন বাচাল এবং আরো একশো একটি মুক্তোর সমষ্টি। এ-জন্যেই হয়তো পরাধীন থেকেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। যে-ই বিদেশ থেকে হানা দিয়েছে, তার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে বাঙালি। মধ্যযুগে খুব বড়ো বাঙালির পরিচয় বিশেষ পাওয়া যায় না। বড়ো বাঙালিরা আবির্ভূত হতে থাকে উনিশশতকে।


উনিশশতকই হচ্ছে মহৎ বাঙালিদের শতাব্দী। এই মহতেরা কীভাবে জন্মালেন? এর একটা কারণ সম্ভবত ইংরেজদের সংস্পর্শ। ইংরেজের চরিত্রের যে-প্রচণ্ড শক্তি, তার কিছুটা সংক্রামিত হয়েছিলো বিদ্যাসাগর, রামমোহন, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ ও আরো কারো কারো চরিত্রে। খাঁটি বাঙালিরা মহৎ বাঙালি নয়, বাঙলার বিবর্তনে তাদের কোনো অবদান নেই। বিশশতকেও যাঁরা প্রধান হয়েছেন, তাঁরা খাঁটি বাঙালি নন, তাঁদের মধ্যেও ইউরোপীয় চরিত্রের মিশেল রয়েছে। সুভাষ বসু বাঙালি? মনে হয় জাপানি বা জর্মন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাঙালি? বাঙালি হ’লে তো দু’একটি ছিঁচকে বই লিখেই শিষ্যদের মুখে মুখে অমর মনীষী হয়ে যেতেন। তিনি যে-বিশাল বই লেখার দুঃসাহস দেখালেন, এতে তাঁকে জর্মন না মনে ক’রে উপায় নেই। এমন উচ্চাভিলাষ কি বাঙালির আছে! বাঙালি ক্ষুদ্র এবং চারপাশের সবকিছুকে ক্ষুদ্র ক’রে রাখতে চায়। এর প্রমাণ পাই বাঙালির প্রিয় প্রবাদে। ভূয়োদর্শী প্রবাদপ্রণেতা পরামর্শ দিয়েছেন, বেশি বড়ো হয়ো না ঝড়ে ভেঙে পড়বে, বেশি ছোটো হয়ো না ছাগলে খেয়ে ফেলবে। বাঙালি আকাশচুম্বী হবে না, তার দর্শন ছাগলের নাগালের ওপরে ওঠা। কিন্তু অধিকাংশই উঠতে পারে না। বাঙালি, তুমি কবে তোমার চরিত্রের মুক্তোগুলো খুইয়ে মানুষ হবে?

হুমায়ূন আজাদের এই লেখাটি সংগ্রহ করেছি Anik Andalib-এর ফেসবুক পাতা থেকে। 

Wednesday, September 5, 2012

বিচ্ছিন্ন গণিত - ৩

আস্তে আস্তে লিখে ফেলার পরিকল্পনা করেছি। সমস্যা হচ্ছিলো লেখার মাধ্যম নিয়ে। পুরাতন ল্যাপটপটা অকেজো হয়ে পড়ে আছে কিছুদিন। আমার আলস্যেই ঠিক করা হচ্ছে না। এদিকে ম্যাক এ বাংলা অঙ্কুর ব্যবহার করি। এটা বাংলা থেকে ইংরেজীতে সুইচ করার কীবোর্ড শর্টকাট খুঁজে পাইনি। ফলে গণিত টেক্সটে ফর্মূলা গুলো কিভাবে বসাবো তাই নিয়ে বিপদে পড়ে গেছিলাম। বাক্যের মধ্যে অনেকবার ইংরেজী কীবোর্ডে যেতে হবে।
কিন্তু সমাধানটা হাতের কাছেই ছিলো। উইকিপিডিয়া। বাংলা উইকিপিডিয়ার ওয়েব ফর্মে নানান রকম কীবোর্ড আছে। এবং সেখানে কীবোর্ড শর্টকাট ব্যবহার করে বাংলা/ইংরেজি টগল করা যায়। এমনকি ল্যাটেক ফরম্যাটে লিখলে ইকুয়েশনও রেন্ডার করতে পারে। ভাবছি ঐ ওয়েব ফর্মকেই আমার এডিটর হিসাবে ব্যবহার করবো।

একটা জিনিস বুঝতে পারছি। গণিত বই সাহিত্যের মত করে লিখলে হবে না। মানে গল্প লেখার সময় যেমন, একটা ফ্লোর মধ্যে লিখে ফেলে মানুষ পরে মাইনর পরিবর্তন করে। গণিতে এটা করা যাবে না। প্রথম ইটারেশনে এসেনশিয়াল জিনিসগুলো লিখতে হবে। মানে, একেবারে কাঠখোট্টা একটা পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা। এভাবে একটা অধ্যায়ের ফ্রেমওয়ার্ক দাড়িয়ে গেলে, নিজিস্ব চিন্তা, উদাহরণ, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ যোগ ককরতে হবে।

যাইহোক, লেখা নিয়ে আমার থিওরীস্ট বনাম এক্স্পেরিমেন্টালিস্ট ধরণের এক রকম খেলা চলবে মনে হচ্ছে। হয়তো লিখতে বসে আবিষ্কার করবো এই পদ্ধতি ভালো মত কাজ করছে না। তখন নতুন প্ল্যান অফ অ্যাকশন বের করতে হবে। দেখা যাক। 

Monday, August 27, 2012

বিচ্ছিন্ন গণিত - ২

একটা সময় পর্যন্ত আমি খুব আগ্রহ করে পাবলিক ব্লগে লিখেছি। এখনো ইচ্ছাটা আছে, কিন্তু নানা কারনে আগ্রহটা কমে গেছে। যাকগে সে আলাপ পরে। আপাতত এই পোস্টটা লিখছি, ভাবনা গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। কারণ, " লেখা হচ্ছে গুছিয়ে ভাবা"। বইয়ের অধ্যয়ায় গুলো যেভাবে সাজানো হবে সেই ক্রমেই লিখতে হবে তেমন কোনো কথা নেই। বই লেখাটা হচ্ছে সিনেমা বানানোর মত। যখন যে শট নিলে অপটিমাল হয় সেটা নিয়ে রাখতে হবে। পরে সাজিয়ে গুছিয়ে কেটে ছিড়ে মিলিয়ে একটা সুন্দর বই বানিয়ে ফেললেই হলো। ইনফ্যাক্ট সিনেমাকে অনেকে ব- ই বলে। হা হা হা!

শুরু করতে হবে সেট দিয়ে। তারপর রিলেশন, ফাংশন, ওয়েল অর্ডারিং প্রিনসিপাল, ইনডাকশন, ক্লোজার, ইকুইভ্যালেন্স ক্লাস এভাবে এগোবে।

সেট- সেটকে ফান্ডামেন্টাল ম্যাথমেটিক্যাল অবজেক্ট হিসাবে বর্ণনা করতে হবে। সেট নিয়ে মজার মজার, প্রবলেম দেওয়া যেতে পারে। টাইপ-সেট আপাতত এম এস ওয়ার্ডেই করবো। ইকুয়েশনগুলো হাতে একটা ডায়েরীতে লিখে রাখতে হবে। বইয়ের লেখায় স্রেফ কথাগুলো থাকবে। ইকুয়েশনগুলোর জন্য প্লেস হোল্ডার রেখে দেব। পরে হয়তো ল্যাটেকে টাইপসেট করবো। এই পোস্টে যে বিষয়গুলোর কথা লিখলাম সেগুলো লেখা শেষ হলে বন্ধুদেরকে কপি দেওয়া যেতে পারে। একটা ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট ও চালু করতে হবে। কিন্তু এখন ওসব নিয়ে ভাবতে চাচ্ছি না।

একটা সময় পর্যন্ত ভাবতাম এমন বই লিখতে হবে যেটা সবার কাজে লাগবে। কিন্তু পৃথিবীর কোনো বইই "সবার" কাজে লাগে না। এমন কি সব কম্পিউটার বিজ্ঞানী-ইঞ্জিনিয়ার-প্রোগ্রামার হতে ইচ্ছুকরাও উপকৃত হবে সেটা ভাবারো কারণ নেই। একটা পার্টিকুলার বিষয়ের জন্য প্রস্তুত মাইন্ডসেটের পার্টিকুলার শতাংশ মানুষ থাকে। আমাদের দেশে কোটি কোটি মানুষ হওয়ার সুবিধা হলো, এই পারসেণ্টেজ যতই কম হোক, মোট সংখ্যাটা কম নয়। এবং এদের অনেকেই হয়তো রিসোর্সের অভাবে এগোতে পারছে না। তাদের লক্ষ্য করেই লেখা হবে বইঅটা। সব কিছু শিখিয়ে ফেলার বদলে, একটা স্মুথ স্টার্টিং পয়েন্ট দেওয়াটাই লক্ষ্য। এগুলো ভালো লাগলে, এবন শিখতে পারলে "ধারণার" অংশটা কিছুটা পরিণত হবে। তখন তারা বড় বড় এবং আরো সুন্দর সব বই নিজে থেকেই পড়তে পারবে বলে মনে করি। শুধু এটুকু কন্ট্রিবিউট করাটাই উদ্দেশ্য। 

বিচ্ছিন্ন গণিত - ১

বিচ্ছিন্ন গণিতের (ডিস্ক্রিট ম্যাথ) একটা বই লেখা যেতে পারে। ইংরেজীতে এত এত সুন্দর বই আছে এই বিষয়ে। কিন্তু বাংলায় নেই। এই ব্যাপারটা দুর্ভাগ্য জনক। আমার যদি অনেক বড় প্রতিষ্ঠান থাকতো। তাহলে আমি কিছু মানুষকে নিয়ে রোজেনের ডিস্ক্রিট ম্যাথ বইটা অফিসিয়ালি অনুবাদ করার প্রোজেক্ট হাতে নিতাম। কিন্তু সেটা সম্ভব না। আর এসব বই অনুবাদ করার পরে প্রকাশ করা নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হয়। আমাদের দেশে প্রকাশকরা প্রফেশনাল না। স্টিফেন হকিং এর দ্য গ্রান্ড ডিজাইন অনুবাদ করার পরে প্রকাশ করতে পারিনি। কপিরাইট ব্লা ব্লা, এসবের যে আইনগত জটিলতা সেটাও যদি লেখক/অনুবাদককে সামলাতে হয় তাহলে আর প্রকাশনা সংস্থার কাজটা কি হলো? বিজ্ঞান এর বই এর জন্য ভালো এডিটর ও তারা জোগাড় করে দিতে পারে না। বাংলাদেশে বিজ্ঞান, বা টেকনিক্যাল বিষয়ের বই ছাপানো একটা নিঃসঙ্গ জার্নি। ঘরের খেয়ে বা না খেয়ে, বনের মোষ, সিংহ, হাতি, শিয়াল সব কিছু এক সঙ্গে তাড়ানোর তুল্য। যাকগে এসব কথা রাখি।

এখন এই যেহেতু অবস্থা, সেহেতু ঐসব সুন্দর বই এর অনুবাদ করা সম্ভব হবে না। নিজেকেই কিছু মিছু লিখতে হবে। ইন ফ্যাক্ট একটা ইম্প্যাক্টফুল বই লেখার জন্য রোজেনের মত এত বড় কলেবরে বই লেখার দরকারও নেই। বেসিক বিষয়গুলো কভার করলেই হবে। আমরা আজকাল ইংরেজী মুভি দেখে দেখে অনেক ইংরেজী শিখেছি। আমি জখন স্কুল কলেজে পড়তাম তখন এতটা ইংরেজী জানতাম না, আশেপাশেও অত ইংরেজী জানা ছেলেমেয়ে দেখিনি। কিন্তু ইংরেজ দেশেও লেখাপড়া না করলে ঠিকই মানুষ মূর্খ হয়। এমন কি বই এর সাথে সম্পর্ক না থাকলে ইংরেজীতে এত শত কোটি ইন্টারেস্টিং বই থাকা সত্তেও তারা পড়তে ব্যর্থ হয়। যেখানে ইংরেজী পড়তে জানা আর ইংরেজী বই পড়তে জানার মধ্যেই যোজন যোজন তফাত, সেখানে ইংরেজী মুভি দেখে শেখা ইংরেজী নিয়ে ডিস্ক্রিট ম্যাথের বই পড়া দুধের শিশুকে খাশির রেজালা খাওয়ানোর মত ব্যাপার। বদ হজম জার একমাত্র গন্তব্য। এবং তা-ই হচ্ছে।

যাকগে এসব ভাষা-রাজনৈতিক আলাপ রাখি। মূল কথা যেটা বলতে চাচ্ছিলাম, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা অনেকটা ইংরেজী শিখে ফেললেও, ইংরেজীতে ডিস্ক্রিট ম্যাথ এর মত বই পড়তে শিখেনি। এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়তে গেলে যেহেতু খুব শুরুর দিকেই তাকে এই বিষয় শিখতে হয়, সেহেতু অপরিণত মনের উপর চাপ পড়ে যায়। কারণ বিষয়টা বেশ কনসেপচুয়াল। অনেকটা খুড়িয়ে খুড়িয়ে হিমালয় পড়া দেওয়ার মত হয়। হিমালয় যতই সুন্দর হোক, হিমালয় পাড়ি দেওয়া যতই রিওয়ার্ডিং হোক, খুড়িয়ে হিমালয় পাড়ি দেওয়া সহজ কথা নয়। অতয়েব, বাংলায় বিচ্ছিন্ন গণিতের মূল ও মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে লিখতেই হচ্ছে। দেখা যাক এর কোনো উপকারিতা আছে কি না। এই বই লেখার সিদ্ধান্ত কেন নিলাম, বা ইত্যাদি পিছনের ব্যাপার স্যাপার নিয়ে তাই আমি আর মাথা ঘামাবো না। এই ব্লগে বইটা কিভাবে তিলে তিলে গড়ে তুলছি তার একটা ক্রোনলজি সংরক্ষণ করার ইচ্ছা। যেমন নেক্স্ট পোস্টে প্রথমে কি বিষয় নিয়ে লিখতে শুরু করবো সেগুলো নিয়ে ভাববো। 

Thursday, August 23, 2012

গাৎচোরেৎশালা বা যে কারণে হচ্ছে না

কোয়ান্টাম তত্বের মূল ব্যাপারটা হলো কোয়ান্টাম লজিকএ। মানে আমাদের ক্লাসিক্যাল যে বৈজ্ঞানিক অভিক্ষা, তার পুরোটাই চলে আমাদের পরিচিত লজিক্যাল সিস্টেম এ বেইজ করে। কোয়ান্টাম লজিক একটু আলাদা। কারণ আর কিছু না, প্রকৃতি ঐ লজিক মেনে চলে। কম্পিউটার হার্ডওয়ার এর ডিজাইন নিয়ে যাদের একটু জানাশোনা আছে তারা যেমন জানেন, ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারের পুরো ডিজাইনটাই হয় বুলিয়ান অ্যালজ্যাব্রা, ফার্স্ট অর্ডার সেকেন্ড অর্ডার লজিক এসব খাটিয়ে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার ডিজাইন করতে তাই এই কোয়ান্টাম লজিক দরকার। মজার ব্যাপার হলো প্রকৃতিকে বর্ণনা করতেও পুরাতন লজিক আর খাটবে না। এটা এমন এক ধরনের প্যারাডাইম শিফ্ট যে আমাদের মনে যে ভৌত বাস্তবতার চিত্র, সেটাকে কোয়ান্টাম রূপায়নে পরিবর্তন করা বেস সময়, সাধনা ইত্যাদির ব্যাপার হয়ে যায়।

যাই হোক, মনে হচ্ছে এই মূল জিনিশটা ধরতে পেরেছি। এসব ক্ষেত্রে আমার যেটা হয়, সাধারণের বোধগম্য করে কিভাবে কথাটা বলা যায়, তাই নিয়ে মাথা খাটাতে থাকি। করছিলামও তাই। একটা হাইপোথেটিক্যাল দাবার কোর্টে শুধু ঘোড়াগুলো যদি কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর নিয়ম মেনে চলে তাহলে খেলাটা কি পরিমান এক্সাইটিং হয়ে যাবে ভাবতে ভাবতে, সাজিয়ে নিচ্ছিলাম তেমন একটা উদাহরণ। এরই ফাকে ফাকে ফাইনম্যানের বইটা থেকে পড়ছি, নতুন নতুন সমীকরণ, সমস্যা এসব নিয়েও মাথা খাটাচ্ছি। কিন্তু আজকাল যেটা হয়, যতোই এক্সাইটিং জিনিস পড়ি না কেন, ঘন্টা তিনেক পরে ঠিকই কেমন একটা ঝিমানি আসে। আজকেও এলো। আর অমনি মাথার মধ্যে বেজে উঠলো একটা শব্দ। "গাৎচোরেৎশালা!" এ কি এই বিদঘুটে শব্দ মাথায় এলো কিভাবে! এমনিতেই মেমরী কম, তার কতগুলো বাইট বেদখ্ল হয়ে গেল এই শব্দে!!

তখনই মনে পড়লো আজ সকালে পুরোনো পাপটা আবার করেছি। সেই নীল আইকনটায় টাচ করেছিলাম। ফেসবুক খুলে যাবার পরে মাত্র কয়েক পলক হয়তো ওপেনও ছিলো। কুলদা রায়ের স্টাটাস থেকে তখন এই ভয়ানক অপ্রয়োজনীয় তথ্যটি আমার মাথায় ঢুকে গেছে। তার কোনো পুরাতন শত্রু নাকি এখন পাগল হয়ে এই শব্দ বলতে বলতে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে।

ততক্ষণে ঝাকি দিয়ে সম্বিত ফিরে পেয়েছি। হাতের সমস্যাটা সমাধান করলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে আবারো ঝিমানি এলো! আবারো একগাদা আজেবাজে ইউজলেস নিউরাল পাথ দিয়ে একটা ভ্রমন করে এলো আমার কনশাসনেস অথবা সেমি-কনশাসনেস। আর তখনই মনে পড়ে গেল আগে এমন হতো না।

না, মাঝে মধ্যে ঝিমানি যে আসতো না, তা না। ঝিমানি আসা ব্রেইনের কোনো জরুরি মেকানিজম মনে হয়। তবে অঙ্ক করতে কতে ঝিমানি এলে সেই ঝিমানির মধ্যেও অঙ্কের বাকিটা করে ফেলতাম বেশিরভাগ সময়। এবং স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুততর গতিতেই। আমি নিশ্চিত এই অভিজ্ঞতা সবারই হয়েছে কখনো না কখনো। ব্রেইনের ঐ স্টেটটার চেয়ে মজার কিছু হয় না। এই ব্যাপারটা সম্ভব ব্রেইন থেকে আজাইরা নিউরাল পাথ কম থাকলে। কিন্তু ইন্টারনেট এর কল্যানে অপ্রয়োজনীয় ডিট্যুরের কোনো অভাব নেই আমার মাথায়।

অতয়েব, হচ্ছে না দাদা।

ভাবছি এক ধরণের উপাত্তসংযম চালু করবো। যেখানে, নির্দিষ্ট একটা সময় জুড়ে যে কোনো মূল্যে জাঙ্ক তথ্য থেকে মাথাকে বাঁচাতে হবে।

শরীরের বেলায় অতিপ্রয়োজনীয় খাদ্যের বিপরীতে যেমন আছে মোহনীয় জাঙ্কফুড। তেমনি মনের খোরাক এর বেলায়ও জাঙ্কফুডের অভাব নেই। 

Wednesday, August 22, 2012

পদার্থবিজ্ঞান ও আমি

একভাবে দেখলে "রিলেটিভিটি" পদার্থবিজ্ঞানকে পরিণত করেছিলো জ্যামিতিতে। আর কোয়ান্টাম মেকানিক্স এটাকে পরিণত করেছে "সম্ভাব্যতার তত্তে"। এ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত ট্রাজেডি হচ্ছে, দীর্ঘ সময় ধরে সব রকম সুযোগ সুবিধা থাকা সত্তেও আমি এখনো এদের কোনোটারই এক্সপার্ট না।

ব্যাপার হলো এই বিষয়গুলো খুবই এক্সাইটিং। কিন্তু ঠিক সিনেমা দেখার মত না, সার্ফিং এর মত। আইনস্টাইন তার রিলেটিভিটি বইটার শুরুতে লিখেছিলেন, "I make no pretance of having witheld from the reader difficulties which are inherent to the subject". অর্থাৎ এসব বিষয়ের কিছু অন্তর্গত কাঠিন্য আছে যা স্বীকার করে নেওয়াই ভালো। কিন্তু এই কাঠিন্য অতিক্রম, উপভোগ বা আয়ত্ব করতে  এক রকম মানসিক অবস্থা দরকার। মনে হয় সেই অবস্থাটাই হারিয়ে ফেলেছি। চিন্তার ট্রেইনগুলো সোজা রাস্তায় যাবে কি, এত এত ডিস্ট্রাকশন! আপাতত এইসব ডিস্ট্রাকশন থেকে নিজেকে ডিসএনগেজ করার উপায় নিয়ে  গবেষণা শুরু করলাম।

Saturday, March 24, 2012

নক্ষত্রের কারিগর

বারো বছর বয়সী এক কিশোরের একবার ইচ্ছে হলো কাচের জারে একটা তারা তৈরি করবে। এরপর, তার বয়স চৌদ্দ পুরো হতে না হতে ঠিকই তেমন একটা তারা বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিলো বিশ্বকে। না কোনো খেলনা তারা নয়। সত্যিকারের একটুকরো নক্ষত্রই বানিয়েছিলো সে। সূর্যের এবং অন্য আর সব নক্ষত্রের মধ্যে মধ্যে যেমন হাইড্রোজেন ফিউশন রিয়াকশনের মাধ্যমে অন্য পরমাণুতে পরিণত হয়। সঙ্গে উৎপন্ন হয় শক্তি, যেটাকে আলো আর তাপ হিসাবে আমরা দেখি, অনুভব করি। ঠিক তেমন নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার ঘটাতে পেরেছে সে তার বাড়ির গ্যারেজে। নিজের ছোট্টো পরমাণুগবেষণা কেন্দ্রে। ছেলেটির নাম টেইলর উইলসন। এভাবেই সে আরো একবার প্রমাণ করেছে, প্রচেষ্টা থাকলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।

ছোটোবেলা থেকেই টেইলর ছিলো কৌতূহলি। আর দশজন ছেলেমেয়ের মতই। তবে আর দশজনের থেকে তার পার্থক্য ছিলো উদ্যমে। কোনো একটা ব্যাপারে কৌতূহল বোধ করলে তা যতই জটিল মনে হোক, লেগে থাকতো সে। এবং এক সময় সেগুলো বুঝে ফেলতো ঠিকই। আসলে কোনো কিছু বুঝে ফেলার মধ্যে যে কী অভাবনীয় আনন্দ, তার খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলো সে আরও অনেক আগেই। তাই তো ৯ বছর বয়সে এক মহাশূন্য ও রকেট গবেষনাকেন্দ্রের  জাদুঘরে রকেট ইঞ্জিন দেখতে গিয়ে কীভাবে সেটা কাজ করে তার পুংক্ষাণুপুংক্ষ বর্ণণা দিয়ে চমকে দিয়েছিলো সবাইকে। পরে এক দুঃখজনক ঘটনার মধ্য দিয়ে রকেটসাইন্স রেখে পরমাণু গবেষণায় আগ্রহী হয়ে টেইলর।

সেই বছর তার দাদির মৃত্যু হয় ক্যানসারে। আমরা জানি ক্যানসার নামক এই মারণ ব্যাধির কোনো ভালো চিকিৎসা নেই। কেমোথেরাপি নামক এক রকম আংশিক চিকিৎসা প্রচলিত, যেখানে শরীরের মধ্যে বিষাক্ত সব রাসায়নিক দ্রব্য ঢুকিয়ে দেওআ হয়, আর আশা করা হয় এগুলো গিয়ে সেই ক্যানসার আক্রান্ত কোষগুলোকে মেরে ফেলবে। এমন এক ধরনের কেমো থেরাপিতে শরীরের মধ্যে তেজস্ক্রিয় পরমাণু ঢুকিয়ে দেওআ হয়। এরা গিয়ে তেজষ্ক্রিয় বিক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেরা ক্ষয় হয়ে অন্য ধরনের পরমাণুতে পরিণত হয়, আর নানা রকম তেজষ্ক্রিয় রশ্মি বিকীরণ করে। আর এই রশ্মিগুলোই ক্যানসার কোষকে মেরে ফেলে। এক সময় এই ভয়ংকর পরমাণুগুলো নিঃশেষ হয়ে যায়। আর তখন যদি ক্যানসারকোষগুলো সব মারা গিয়ে থাকে, মানুষটি সুস্থ হয়ে ওঠে। যদিও এই চিকিৎসা সব সময় কার্যকর হয় না এবং প্রচুর সুস্থ কোষও মারা পড়ে এতে। কিন্তু এর চেয়ে খুব ভালো চিকিৎসা এখনও আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

এখন এই তেজস্ক্রিয় পরমাণুগুলো যদি দ্রুত ক্ষয় হতে হতে নিঃশেষ না হয়ে দীর্ঘ্যদিন ধরে একটু একটু করে ক্ষয় হতো, তাহলে সেই আক্রান্ত ব্যক্তি হয়তো ক্যানসারের বদলে তেজস্ক্রিয়তায় ভুগতে ভুগতেই মারা পড়তো। এ কারণেই এই চিকিৎসায় শুধু সেইসব তেজস্ক্রিয় পরমাণু (এদের বলে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ) ব্যবহার করা হয় যারা গঠনগত কারণেই বেশ দ্রুত ক্ষয় হয়। আর এখানেই দেখা দেয় সমস্যার। যে বড় বড় গবেষণাগারে এসব আইসোটোপ তৈরি হয়, সেখান থেকে খুব দূরের কোনো চিকিৎসা কেন্দ্রে ওগুলোকে নিতে নিতেই হয়তো ক্ষয় হয়ে নিঃশেষে হয়ে পড়ে এরা। এমন কি অনেক দূরের কোনো রোগীকে চিকিৎসা করতে কখনও প্রাইভেট জেটে করেও এগুলোকে দ্রুত বয়ে নিতে হয়। এদেরকে সংরক্ষণ করাও সম্ভব নয়। তাই সাধারণ কারো পক্ষে এই চিকিৎসা হয়ে পড়ে প্রায় অসম্ভব। টেইলর তার দাদির ক্ষেত্রেও এই কেমিক্যালগুলোর দুস্প্রাপ্যতা লক্ষ্য করেছিলো। আর তখনই সে সিদ্ধান্ত নেয় এই অতিপ্রয়োজনীয় তেজস্ক্রিয় আইসোটগুলো নিজেই বানিয়ে ফেলবে সে। কিন্তু তেজস্ক্রিয় আইসোটপ সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তৈরি করা যায় না। এর জন্য লাগে নিউক্লিআর বিক্রিয়া। আর তার জন্য প্রয়োজন পারমানবিক চুল্লি। কিন্তু এই চুল্লি সে কোথায় পাবে?

আমরা অনেকে হয়তো পেপার-পত্রিকায় বা টিভি-ইনটারনেটে পরমাণুচুল্লি দেখে থাকবো। কিন্তু আমরা কি জানি, যে সৌরজগতের সবচেয়ে বড় পরমানুচুল্লিটাকে আমরা দেখি প্রতিদিনই? সেটা হচ্ছে সূর্য। শুধু সূর্য না, যে অসংখ্য তারা দেখি আমরা রাতে সেগুলোও একেকটা পরমাণুচুল্লি। এদের কেউ কেউ সূর্যের চেয়েও বড়, কিন্তু বহু আলোকবর্ষদূরে হওয়ায় এদেরকে ছোটো দেখায়। আর এদের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে তেজস্ক্রিয় বিক্রিয়া। নির্দিষ্ট করে বললে হাইড্রোজেন ফিউশন বিক্রিয়া। যেখানে একাধিক হাইড্রোজেন পরমানু মিলে হিলিয়াম পরমাণু তৈরি করে। আর নির্গত করে আলো সহ নানান রকম তেজস্ক্রিয় কণিকা। টেইলর সিদ্ধান্ত নেয় নিজের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য এমন এক টুকরো তারাই বানিয়ে ফেলবে সে। যাতে সেই বিক্রিয়ায় উৎপন্ন নিউট্রনের সাহায্যে কেমোথেরাপিতে প্রয়োজনীয় আইসোটোপগুলো বানিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। আর শুধু এই তেজস্ক্রিয় বিক্রিয়া ঘটাতে পারলেই চলবে না, তার ফিউশন রিয়্যাক্টরটিকে হতে হবে ছোটোখাটো। যেন দূর দূরান্তের হাসপাতালগুলোতে এ ধররনের রিয়াক্টর বানিয়ে সেখান থেকেই কেমোথেরাপির জন্য প্রয়োজনীয় রেডিও আইসোটোপ তৈরি করা সম্ভব হয়। আর এভাবেই সে স্বপ্ন দেখে কাঁচের জারে একটা তারা তৈরির।

টেইলর উইলসন একজন কিশোর হলেও সে হচ্ছে সেই শ্রেণীর মানুষ যারা নিজের স্বপ্নকে অবহেলায় দূরে ঠেলে দিতে পারে না। পাঠিয়ে দিতে পারে না বৃদ্ধাশ্রম বা কোনো অনাথ আশ্রমে। কবর দিতে পারে না, কোনো অসম্ভবের ভয় বা আলস্যের নীচে। তাই এই স্বপ্নটাকে বাস্তবায়নের জন্যও সে উঠে পড়ে লাগে। একে একে শিখে নেয় ক্যালকুলাস সহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের গণিত, আধুনিক পদার্থবিদ্যা, আর রসায়ন। ফিউশন বিক্রিয়ায় ঘটার সময় ৫০০ মিলিয়ন ডিগ্রি কেলভিন তাপমাত্রার প্লাজমা উৎপন্ন হয়। এটাকে পৃথিবীর কোনো পাত্রেই রাখা সম্ভব নয়। যেকোনো কিছুকেই গলিয়ে নিমেষে ধ্বংস করে ফেলবে সেটা। তাই এই প্রচন্ড ফিউশন বিক্রিয়ার প্লাজমাকে চৌম্বক ও তড়িৎক্ষেত্রের মধ্যে ভাসিয়ে রাখতে হয় সুক্ষ্ম ভারসাম্যে। ইরেনিয়াম দিয়ে যে পারমানবিক চুল্লি চালানো হয়, সেখানে হয় ফিশান বিক্রিয়া। অর্থাৎ বড় একটা পরমাণু ভেঙ্গে ছোটো ছোটো পরমাণু তৈরি হয় ওতে। এই বিক্রিয়ার বিঃধ্বংসি ক্ষমতা আমরা সবাই জানি। দুর্ঘটনার আশংকাও থাকে তাই অনেক। কিন্তু টেইলরের বিক্রিয়াটা 'ফিউশন' বিক্রিয়া। যেখানে ছোটো ছোটো হাইড্রোজেনের পরমানু (আসলে হাইড্রোজেনের ডিউটেরিআম নামক একটা আইসোটোপ) মিলে বড় হিলিয়াম পরমাণু তৈরি করে। এই বিক্রিয়াকে চালিয়ে নিতে এর প্লাজমাকে খুব সূক্ষ্মভাবে শূন্যে ভাসিয়ে রাখতে হয়। একটু এদিক ওদিক হলেই এটা কোনো কিছুর সংস্পর্শে এসে, তাপমাত্রা হারায়, এবং বিক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। তাই ফিউশন বিক্রিয়ায় বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সূর্যের কেন্দ্রের মত উত্তপ্ত এই প্লাজমা কেন্দ্রকে সুক্ষ্মভাবে ভাসিয়ে রাখা যেনতেন কথা নয়। তড়িৎচৌম্বকত্বের গুড়তত্ত্বগুলো শিখে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রগুলো বানাতেঅ জানতে হবে। টেইলর একে একে শিখে নেয় সবই। তৈরিও করে ফেলে সব, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে। শুনতে অসম্ভব মনে হলেও নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ভয় না পেলে যে কোনো কিছুই সম্ভব সেটা প্রমাণ করে ছাড়ে সে। তার বাড়ির গ্যারেজে, সে বানাতে সক্ষম হয় একটা প্রচন্ড উজ্জ্বল নীলচে বেগুণী তারা।

এখানেই থেমে থাকেনি টেইলর। এগুলোর সাহায্যে ঠিকই, কেমোথেরাপিতে প্রয়োজনীয় তেজস্ক্রিয় আইসোটোপও বানাতে সক্ষম হয় সে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের জন্য কয়েকশ ডলার দামের এমন একটা [বিষফোরক সনাক্তকারী] ডিটেক্টরও বানাতে সক্ষম হয়, যেটা লক্ষ ডলারের ডিটেক্টরের থেকেও শত গুণে বেশি সংবেদনশীল। টেইলর মনে করে এই ফিউশন বিকারকের মাধ্যমেই একদিন বিশ্বের শক্তির চাহিদা পূরণ হবে।

এতকিছু শেখার জন্য টেইলর নানান সময়ে যোগাযোগ করেছে, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সাথে। তারাও সাগ্রহে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে তথ্যের মূল উৎস ছিলো ইনটারনেট। 'ফিউজর ডটনেট' [১] নামক একটা ওয়েবসাইটই আছে, যেখানে ফিউশন বিকারক বা ফিউজর বানানোর উপায় নিয়ে আলোচনাকরে আগ্রহীরা। নিজেদের আবিষ্কারকে একে সবার সাথে উন্মুক্তভাবে শেয়ারও করে। ইনটারনেট সংযোগ আছে, এমন প্রতিটি মানুষের নাগালের মধ্যেই আছে পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়ে সকল তথ্য। চাই শুধু স্বপ্ন দেখার আর তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পরিশ্রমের সাহস।

সূত্র:-
[১] ফিউজর ডট নেট http://www.fusor.net/
[২] টেইলরকে নিয়ে 'পপুলার সাইন্স' নামক অলনাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত আর্টিকেল http://www.popsci.com/science/article/2012-02/boy-who-played-fusion?page=all
[৩] টেইলর এর টেড প্রোফাইল - http://www.ted.com/speakers/taylor_wilson.html
[৪] টেইলরের নিজস্ব ওয়েবসাইট - http://sciradioactive.com/Taylors_Nuke_Site/About_Me.html

[৫]  টেইলরের তিন মিনিট দীর্ঘ টেড বক্তৃতা - -

Yup, I built a nuclear fusion reactor